Skip to content

তাওহীদ কাকে বলে? কত প্রকার ও কি কি ?

তাওহীদ এর আভিধানিক অর্থ কোনো জিনিসকে একক হিসেবে গণ্য করা। যেমনঃ আমরা বলব, “আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো মাবূদ নেই” একথার সাক্ষ্য দেওয়া ব্যতীত কোনো ব্যক্তির তাওহীদ পূর্ণ হবে না। যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য প্রদান করবে, সে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য সকল বস্তু হতে উলুহিয়্যাতকে (ইবাদাত) অস্বীকার করে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য তা সাব্যস্ত করবে। মুসলিম বিদ্বানগণ তাওহীদকে তিনভাগে বিভক্ত করেছেন যেমনঃ
১। তাওহীদুর রুবূবীয়্যাহ।
২। তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ।
৩। তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত।
কুরআন ও হাদীস গভীরভাবে গবেষণা করে আলিমগণ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, তাওহীদ উপরোক্ত তিন প্রকারের মাঝে সীমিত।

প্রথমত: তাওহীদে রুবূবীয়্যার:

সৃষ্টি, রাজত্ব, কর্তৃত্ব ও পরিচালনায় আল্লাহকে এক হিসাবে বিশ্বাস করার নাম তাওহীদে রুবূবীয়্যাহ।

১ । সৃষ্টিতে আল্লাহর একত্ব:

আল্লাহ একাই সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা। তিনি ছাড়া অন্য কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন-
অর্থঃ “আল্লাহ ছাড়া কোনো স্রষ্টা আছে কী? যে তোমাদেরকে আকাশ ও জমিন হতে জীবিকা প্রদান করে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো মা‘বূদ নেই।”
সূরা ফাতির আয়াত: ৩
সুতরাং মহান আল্লাহ তায়ালা একমাত্র সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা। তিনি সকল বস্তু সৃষ্টি করেছেন এবং সুবিন্যস্ত করেছেন। মহান আল্লাহ তায়ালার কর্ম এবং মাখলুকাতের কর্ম সবই আল্লাহর সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। তাই মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের কর্মসমূহও সৃষ্টি করেছেন- একথার ওপর ঈমান আনলেই তাকদীরের ওপর ঈমান আনা পূর্ণতা লাভ করবে।
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
অর্থঃ “আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে আর তোমরা যা তৈরি কর সেগুলোকেও।”
সূরা আস-সাফফাত আয়াত: ৯৬
এই সকল অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে তওহীদের গুরুতত্ত্বকে উজ্জ্বল করা হয়েছে যে, আল্লাহই এই সকল বস্তুর সৃষ্টিকর্তা। কিন্তু তাকে ছেড়ে যাদের তোমরা ইবাদত করছ, তারা কি কিছু সৃষ্টি করেছে? অবশ্যই না, বরং তারাই আল্লাহর সৃষ্টি। অতএব স্রষ্টা ও সৃষ্টি কিভাবে এক সমান হতে পারে? অথচ তোমরা তাদেরকে আল্লাহর সমতুল্য করে রেখেছ, তোমরা কি একটুও চিন্তা কর না? কাফিরদের অন্তসার শুন্য মা‘বূদদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
অর্থঃ “সুতরাং যিনি সৃষ্টি করেন, তিনি কি তারই মতো, যে সৃষ্টি করে না? তবুও কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে না?”
সূরা আন-নাহল আয়াত: ১৭
মানুষের কাজসমূহ মানুষের গুণের অন্তর্ভুক্ত। আর মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি। কোনো জিনিসের স্রষ্টা উক্ত জিনিসের গুণাবলীরও স্রষ্টা। নিন্মের আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, মানব সৃষ্টির সাতটি স্তর উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বপ্রথম স্তর মৃত্তিকার সারাংশ, দ্বিতীয় বীর্য, তৃতীয় জমাট রক্ত, চতুর্থ মাংসপিণ্ড, পঞ্চম অস্থি-পিঞ্জর, ষষ্ঠ অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃতকরণ ও সপ্তম সৃষ্টিটির পূর্ণত্ব অর্থাৎ রূহ সঞ্চারকরণ। আল্লাহ্ তা’আলা কুরআনে এ শেষোক্ত স্তরকে এক বিশেষ ও স্বতন্ত্র ভঙ্গিতে বর্ণনা করে বলেছেনঃ “তারপর আমরা তাকে এক বিশেষ ধরনের সৃষ্টি দান করেছি।” এই বিশেষ বর্ণনার কারণ এই যে, প্রথমোক্ত ছয় স্তরে সে পূর্ণত্ব লাভ করেনি। শেষ স্তরে এসে সে সম্পূর্ণ এক মানুষে পরিণত হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, কাফিরদের অন্তসার শুন্য মা‘বূদদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
অর্থঃ “পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি রক্তপিন্ডে, অতঃপর রক্তপিন্ডকে পরিণত করি মাংসপিন্ডে এবং মাংসপিন্ডকে পরিণত করি অস্থিপঞ্জরে; অতঃপর অস্থিপঞ্জরকে ঢেকে দিই মাংস দ্বারা; অবশেষে ওকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টি রূপে; অতএব নিপুণতম স্রষ্টা আল্লাহ কত কল্যাণময়!”
সূরা আল-মুমিনূন আয়াত: ১৪
অনুরূপভাবে হাদিসের বর্ণনায় রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ
ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) ….. আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি একটি বসার গদি ক্রয় করলেন, তাতে বহু ছবি ছিল। তা দেখে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দরজায় (ঘরে না ঢুকে) দাঁড়িয়ে রইলেন। আমি তার মুখমণ্ডলে অপছন্দের বিষণ্ণতা দেখলাম- অথবা বর্ণনাকারী বলেছেন, তার অবয়বে বিমৰ্ষতার সাদৃশ্য প্রত্যক্ষ হলো। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি আল্লাহ ও তার রসূলের নিকট তওবা করছি। কিন্তু আমি কি অন্যায় করেছি? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ গদির বিষয় কি? তিনি বললেন, আপনার জন্য আমি এটি ক্রয় করেছি, আপনি তাতে বসবেন এবং তাতে হেলান দিবেন। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এসব ছবি তৈরি কারীদের (শাস্তি) দেয়া হবে এবং তাদের বলা হবে- তোমরা যা তৈরি করেছে তা জ্যান্ত করো। অতঃপর বললেন, যে গৃহে ছবি থাকে, সেখানে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।
মুসলিম সহীহ হাদীসঃ ৫৪২৬ হাদিস একাডেমি, ২১০৭ আন্তঃ
উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তর এই যে, আল্লাহর মতো করে কোনো মানুষ কিছু সৃষ্টি করতে অক্ষম। মানুষের পক্ষে কোনো অস্তিত্বহীনকে অস্তিত্ব দেওয়া সম্ভব নয়। কোনো মৃত প্রাণীকেও জীবন দান করা সম্ভব নয়। আল্লাহ ছাড়া অন্যের তৈরি করার অর্থ হলো, নিছক পরিবর্তন করা এবং এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরিত করা মাত্র। মূলতঃ তা আল্লাহরই সৃষ্টি। ফটোগ্রাফার যখন কোনো বস্তুর ছবি তুলে, তখন সে সেটাকে সৃষ্টি করে না; বরং বস্তুটিকে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তন করে মাত্র। যেমন, মানুষ মাটি দিয়ে পাখির আকৃতি তৈরি করে এবং অন্যান্য জীব-জন্তু বানায়। সাদা কাগজকে রঙ্গীন কাগজে পরিণত করে। এখানে মূল বস্তু তথা কালি, রং ও সাদা কাগজ সবই তো আল্লাহর সৃষ্টি। এখানেই আল্লাহর সৃষ্টি এবং মানুষের সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে উঠে।

২। রাজত্বে আল্লাহর একত্ব:

মহান রাজাধিরাজ একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। সুতরাং সর্ব সাধারণের বাদশাহ একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। কাউকে বাদশাহ বলা হলে তা সীমিত অর্থে বুঝতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা অন্যের জন্যেও রাজত্ব ও কর্তৃত্ব সাব্যস্ত করেছেন। তবে তা সীমিত অর্থে।
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন:
অর্থঃ “অতি মহান ও শ্রেষ্ঠ তিনি, সর্বময় কর্তৃত্ব ও রাজত্ব যাঁর হাতে; তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। ”
সূরা আল-মুলক আয়াত: ১
মহান আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন:
অর্থঃ “বলঃ সব কিছুর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব কার হাতে? তিনি (সকলকে) আশ্রয় দেন, তাঁর উপর কোন আশ্রয় দাতা নেই, (বল) তোমরা যদি জান।”
সূরা আল-মুমিনূন আয়াত: ৮৮
মহান আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন:
অর্থঃ “তবে তোমাদের স্ত্রীগণ অথবা তোমাদের আয়ত্বধীন দাসীগণ ব্যতীত।”
সূরা আল-মুমিনূন আয়াত: ৬
আরো অনেক দলীলের মাধ্যমে জানা যায় যে, আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরও রাজত্ব রয়েছে। তবে এ রাজত্ব আল্লাহর রাজত্বের মতো নয়। সেটা অসম্পূর্ণ রাজত্ব। তা ব্যাপক রাজত্ব নয় বরং তা একটা নির্দিষ্ট সীমারেখার ভেতরে। তাই উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, যায়েদের বাড়ীতে রয়েছে একমাত্র যায়েদেরই কর্তৃত্ব ও রাজত্ব। তাতে আমরের হস্তক্ষেপ করার কোনো ক্ষমতা নেই এবং বিপরীত পক্ষে আমরের বাড়ীতে যায়েদও কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তারপরও মানুষ আপন মালিকানাধীন বস্তুর ওপর আল্লাহ প্রদত্ত নির্ধারিত সীমারেখার ভিতরে থেকে তাঁর আইন-কানুন মেনেই রাজত্ব করে থাকে। এজন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অকারণে সম্পদ বিনষ্ট করতে নিষেধ করেছেন।
মহান আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন:
অর্থঃ “আর তোমরা নির্বোধদের হাতে তোমাদের ধন-সম্পদ দিও না, যাকে আল্লাহ তোমাদের জন্য করেছেন জীবিকার মাধ্যম এবং তোমরা তা থেকে তাদেরকে আহার দাও, তাদেরকে পরিধান করাও এবং তাদের সাথে উত্তম কথা বল।”
সূরা আন-নিসা আয়াত: ৫
উপরোক্ত আয়াতে ধন-সম্পদের গুরুত্ব এবং মানুষের জীবন ধারণের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং সম্পদের হেফাযতের ক্ষেত্রে একটা সাধারণ ক্রটির সংশোধন নির্দেশ করা হয়েছে। তা হচ্ছে, অনেকেই স্নেহান্ধ হয়ে অল্পবয়স্ক, অনভিজ্ঞ ছেলে-মেয়ে অথবা স্ত্রীলোকদের হাতে ধন-সম্পদের দায়-দায়িত্ব তুলে দেয়। যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি সম্পদের অপচয় এবং যা দারিদ্র ঘনিয়ে আসার আকারে দেখা দেয়। আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন যে, কুরআনুল কারীমের এ আয়াতে নির্দেশ করা হচ্ছে যে, তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদ অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান-সন্ততি কিংবা অনভিজ্ঞ স্ত্রীলোকদের হাতে তুলে দিয়ে তাদের মুখাপেক্ষী হয়ে থেকো না, বরং আল্লাহ্ তা’আলা যেহেতু তোমাকে অভিভাবক এবং দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছেন, সেজন্য তুমি সম্পদ তোমার নিজের হাতে রেখে তাদের খাওয়া-পরার দায়-দায়িত্ব পালন করতে থাক। যদি তারা অর্থ-সম্পদের দায়িত্ব নিজ হাতে নিয়ে নেয়ার আব্দার করে, তবে তাদেরকে ভালভাবে বুঝিয়ে দাও যে, এসব তোমাদের জন্যই সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে তাদের মনোকষ্টের কারণ না হয়, আবার সম্পদ বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও দেখা না দেয়। উপরোক্ত ব্যাখ্যা মতে, এমন সবার হাতেই সম্পদ অৰ্পন করা যাবে না যাদের হাতে পড়ে ধন-সম্পদ বিনষ্ট হওয়ার আশংকা রয়েছে। এতে ইয়াতীম শিশু বা নিজের সন্তানের কোন পার্থক্য নেই। আবু মূসা আশ’আরী রাদিয়াল্লাহু আনহুও এ আয়াতের এরূপ তাফসীরই বর্ণনা করেছেন। [তাবারী]
নিজের মালের হেফাজত করতে গিয়ে যদি কেউ নিহত হয়, তবে সে শহীদ:
মোটকথা, মালের হেফাজত অত্যন্ত জরুরী এবং অপচয় করা গোনাহের কাজ। নিজের সম্পদের হেফাজত করতে গিয়ে যদি কেউ নিহত হয়, তবে সে শহীদের মর্যাদা পাবে। রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ নিজের মালের হেফাজত করতে গিয়ে যদি কেউ নিহত হয়, তবে সে শহীদ’।
বুখারী সহীহ হাদীসঃ ২৪৮০ আন্তঃ ২৩১৮ ইফাবা, মুসলিম সহীহ হাদীসঃ ১৪১
মানুষের রাজত্ব ও মুলত খুবই সীমিত। আর আল্লাহর মালিকান ও রাজত্ব সর্বব্যাপী এবং সকল বস্তুকে বেষ্টনকারী। তিনি তাঁর রাজত্বে যা ইচ্ছা, তাই করেন। তাঁর কর্মের কৈফিয়ত তলব করার মতো কেউ নেই। অথচ সকল মানুষ তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।

৩। পরিচালনায় আল্লাহর একত্ব:

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এক ও অদ্বিতীয় ব্যবস্থাপক এবং পরিচালক। তিনি সকল মাখলূকাত এবং আসমান-যমিনের সব কিছু পরিচালনা করেন।
মহান আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
অর্থঃ “নিশ্চয় তোমাদের রব আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশে উঠেছেন। তিনি রাত দ্বারা দিনকে ঢেকে দেন। প্রত্যেকটি একে অপরকে দ্রুত অনুসরণ করে। আর (সৃষ্টি করেছেন) সূর্য, চাঁদ ও তারকারাজী, যা তাঁর নির্দেশে নিয়োজিত। জেনে রাখ, সৃষ্টি ও নির্দেশ তাঁরই। আল্লাহ মহান, যিনি সকল সৃষ্টির রব। ”
সূরা আল-আরাফ আয়াত: ৫৪
মহান আল্লাহতায়ালা আরেকটি আয়াতে বলেনঃ
অর্থঃ “তারপর তিনি দু’দিনে আসমানসমূহকে সাত আসমানে পরিণত করলেন। আর প্রত্যেক আসমানে তার কার্যাবলী ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন। আর আমি নিকটবর্তী আসমানকে প্রদীপমালার দ্বারা সুসজ্জিত করেছি আর সুরক্ষিত করেছি। এ হল মহা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নির্ধারণ। ”
সুরা হা-মীম আস-সাজদা (ফুসসিলাত) আয়াত:১৪
মহান আল্লাহতায়ালা আরেকটি আয়াতে বলেনঃ
অর্থঃ “আর আমার আদেশ তো কেবল একটি কথা, চোখের পলকের মত।”
সুরা আল-কামার আয়াত:৫০
মহান আল্লাহতায়ালা আরেকটি আয়াতে বলেনঃ
অর্থঃ ” তিনিই যমীনে যা আছে সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারপর আসমানের প্রতি খেয়াল করলেন এবং তাকে সাত আসমানে সুবিন্যস্ত করলেন। আর সব কিছু সম্পর্কে তিনি সম্যক জ্ঞাত। ”
সুরা আল-বাকারা আয়াত:২৯
মহান আল্লাহতায়ালা আরেকটি আয়াতে বলেনঃ
অর্থঃ ” তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের স্রষ্টা। আর যখন তিনি কোন বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেন, তখন কেবল বলেন ‘হও’ ফলে তা হয়ে যায়।”
সুরা আল-বাকারা আয়াত: ১১৭
আল্লাহর এ পরিচালনা সর্বব্যাপী। কোনো শক্তিই আল্লাহর পরিচালনাকে রুখে দিতে পারে না। কোনো কোনো মাখলূকের জন্যও কিছু কিছু পরিচালনার অধিকার থাকে। যেমন, মানুষ তার ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি এবং কর্মচারীদের ওপর কর্তৃত্ব করে থাকে, কিন্তু এ কর্তৃত্ব নির্দিষ্ট একটি সীমার ভিতরে। উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে আমাদের বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণিত হলো যে, তাওহীদে রুবূবীয়্যাতের অর্থ সৃষ্টি, রাজত্ব এবং পরিচালনায় আল্লাহকে একক হিসাবে বিশ্বাস করা।

দ্বিতীয়ত: তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ

এককভাবে আল্লাহর ইবাদাত করার নাম তাওহীদে উলুহিয়্যাহ। মানুষ যেভাবে আল্লাহর ইবাদাত করে এবং নৈকট্য হাসিলের চেষ্টা করে, অনুরূপ অন্য কাউকে ইবাদাতের জন্য গ্রহণ না করা। তাওহীদে উলুহীয়্যাতের ভিতরেই ছিল আরবের মুশরিকদের গোমরাহী। এ তাওহীদে উলূহিয়াকে কেন্দ্র করেই তাদের সাথে জিহাদ করে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জান-মাল, ঘরবাড়ী ও জমি-জায়গা হরণ হালাল মনে করেছিলেন। তাদের নারী-শিশুদেরকে দাস-দাসীতে পরিণত করেছিলেন। এ প্রকার তাওহীদ দিয়েই আল্লাহ তা‘আলা রাসূলগণকে প্রেরণ করেছিলেন এবং সমস্ত আসমানী কিতাব নাযিল করেছেন। যদিও তাওহীদে রুবূবিয়্যাত এবং তাওহীদে আসমা ওয়াস্ সিফাতও নবীদের দাওয়াতের বিষয়বস্তু ছিল; কিন্তু অধিকাংশ সময়ই নবীগণ তাদের স্বজাতীয় লোকদেরকে তাওহীদে উলুহীয়্যার প্রতি আহ্বান জানাতেন। মানুষ যাতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য ইবাদাতের কোনো অংশই পেশ না করে, সদাসর্বদা রাসূলগণ তাদের উম্মতদেরকে এ আদেশই দিতেন। চাই সে হোক নৈকট্যশীল ফিরিশতা, আল্লাহর প্রেরিত নবী, আল্লাহর সৎকর্মপরায়ণ ওলী বা অন্য কোনো মাখলুক। কেননা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদাত করা বৈধ নয়। যে ব্যক্তি এ প্রকার তাওহীদে ত্রুটি করবে, সে কাফির মুশরিক। যদিও সে তাওহীদে রুবূবীয়্যাহ এবং তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাতের স্বীকৃতি প্রদান করে থাকে। সুতরাং কোনো মানুষ যদি এ বিশ্বাস করে যে, আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকারী, একমাত্র মালিক এবং সব কিছুর পরিচালক, কিন্তু আল্লাহর ইবাদাতে যদি অন্য কাউকে শরীক করে, তবে তার এ স্বীকৃতি ও বিশ্বাস কোনো কাজে আসবে না। যদি ধরে নেওয়া হয় যে, একজন মানুষ তাওহীদে রুবূবীয়্যাতে এবং তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাতে পূর্ণ বিশ্বাস করে; কিন্তু সে কবরের কাছে যায় এবং কবরবাসীর ইবাদাত করে কিংবা তার জন্য কুরবানী পেশ করে বা পশু জবেহ করে তাহলে সে কাফির এবং মুশরিক। মৃত্যুর পর সে হবে চিরস্থায়ী জাহান্নামী।
মহান আল্লাহতায়ালা বলেনঃ
অর্থঃ “ তারা অবশ্যই কুফরী করেছে যারা বলে, মারইয়াম পুত্র মাসীহই হচ্ছেন আল্লাহ। মাসীহ তো বলেছিল, হে বানী ইসরাঈল! তোমরা আল্লাহর ‘ইবাদাত কর যিনি আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশীস্থাপন করে তার জন্য আল্লাহ অবশ্যই জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন আর তার আবাস হল জাহান্নাম। যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। ”
সূরা আল-মায়েদা আয়াত: ৭২
মহান আল্লাহতায়ালা আরেকটি আয়াতে বলেনঃ
অর্থঃ “আর ইয়াহূদীরা বলে, উযাইর আল্লাহর পুত্র এবং নাসারারা বলে, মাসীহ আল্লাহর পুত্র। এটা তাদের মুখের কথা, তারা সেসব লোকের কথার অনুরূপ বলছে যারা ইতঃপূর্বে কুফরী করেছে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন, কোথায় ফেরানো হচ্ছে এদেরকে?”
সুরা আত-তাওবা আয়াত: ৩০
মহান আল্লাহতায়ালা আরেকটি আয়াতে বলেনঃ
অর্থঃ “শিশুটি বলল, ‘আমি তো আল্লাহর বান্দা; তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী বানিয়েছেন’। আর নিশ্চয় আল্লাহ আমার রব এবং তোমাদের রব। সুতরাং তোমরা তাঁর ইবাদাত কর। এটাই সরল পথ।”
সুরা মারইয়াম আয়াত: ৩০,৩৬
মহান আল্লাহতায়ালা আরেকটি আয়াতে বলেনঃ
অর্থঃ “‘নিশ্চয় আল্লাহ আমার রব ও তোমাদের রব। অতএব তোমরা তাঁর ইবাদাত কর। এটি সরল পথ’। ”
সুরা আল ইমরান আয়াত: ৫১
মহান আল্লাহতায়ালা আরেকটি আয়াতে বলেনঃ
অর্থঃ ” নিশ্চয় আল্লাহ, তিনিই আমার রব ও তোমাদের রব। অতএব তাঁর ইবাদাত কর; এটিই সরল পথ। ”
সুরা আয-যুখরুফ আয়াত: ৬৪
মহান আল্লাহতায়ালা আরেকটি আয়াতে বলেনঃ
অর্থঃ ” নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে।, নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমা করেন না তাঁর সাথে শরীক করাকে এবং এ ছাড়া যাকে চান ক্ষমা করেন। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে তো ঘোর পথভ্রষ্টতায় পথভ্রষ্ট হল। ”
সুরা আন-নিসা আয়াত: ৪৮,১১৬

তৃতীয়ত: তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত

তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাতের অর্থ হলো, আল্লাহ নিজেকে যে সমস্ত নামে নামকরণ করেছেন এবং তাঁর কিতাবে নিজেকে যে সমস্ত গুণে গুণাম্বিত করেছেন সে সমস্ত নাম ও গুণাবলীতে আল্লাহকে একক ও অদ্বিতীয় হিসেবে মেনে নেওয়া। আল্লাহ নিজের জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন, তাতে কোনো পরিবর্তন, পরিবর্ধন, তার ধরণ বর্ণনা এবং কোনো রূপ উদাহরণ পেশ করা ব্যতীত আল্লাহর জন্য তা সাব্যস্ত করার মাধ্যমেই এ তাওহীদ বাস্তবায়ন হতে পারে। সুতরাং আল্লাহ নিজেকে যে নামে পরিচয় দিয়েছেন বা নিজেকে যে গুণাবলীতে গুণান্বিত করেছেন, তাঁর ওপর ঈমান আনয়ন করা আবশ্যক।

মূল বিষয়সমূহ:

আল্লাহর নাম ও গুণাবলী:
আল্লাহ নিজেকে যেসব নামে ডেকেছেন (যেমন আর-রহমান, আর-রাহিম) এবং যেসব গুণাবলী আরোপ করেছেন (যেমন আল-আলিম, আল-খালিক), সেগুলোকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা।
কোনো সাদৃশ্য বা রূপান্তর ছাড়া:
তাঁর গুণাবলীকে সৃষ্টিজীবের গুণাবলীর সাথে তুলনা না করা এবং কোনো রূপ বা আকার আরোপ না করা (যেমন, হাত আছে, কিন্তু মানুষের হাতের মতো নয়)।
অস্বীকার ও ভুল ব্যাখ্যা থেকে দূরে থাকা:
আল্লাহর গুণাবলীকে অস্বীকার করা বা সেগুলোর ভুল ব্যাখ্যা করা থেকে বিরত থাকা।
কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ:
কুরআন ও সহীহ হাদীসে যেভাবে আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর বর্ণনা এসেছে, ঠিক সেভাবেই তা মেনে নেওয়া, অতিরিক্ত ব্যাখ্যা বা সংযোজন ছাড়া।

আল্লাহর কতিপয় নামের দৃষ্টান্ত:

১। (الحي القيوم) আল্লাহ তা‘আলার অন্যতম নাম হচ্ছে, আল হাইয়্যুল কাইয়্যুম” এ নামের ওপর ঈমান রাখা আমাদের ওপর ওয়াজিব। এ নামটি আল্লাহর একটি বিশেষ গুণেরও প্রমাণ বহন করে। তা হচ্ছে, আল্লাহর পরিপূর্ণ হায়াত। যা কোনো সময় অবর্তমান ছিলনা এবং কোনো দিন শেষও হবে না। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা চিরঞ্জীব। তিনি সবসময় আছেন এবং সমস্ত মাখলুকাত ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরও অবশিষ্ট থাকবেন। তাঁর কোনো ধ্বংস বা ক্ষয় নেই।
২। আল্লাহ নিজেকে السميع (আস-সামীউ) শ্রবণকারী নামে অভিহিত করেছেন। তার ওপর ঈমান আনা আবশ্যক। শ্রবণ করা আল্লাহর একটি গুণ। তিনি মাখলুকাতের সকল আওয়াজ শ্রবণ করেন। তা যতই গোপন ও অস্পষ্ট হোক না কেন।
৩। ‘আল-করীব’ (নিকটবর্তী) – বিশ্বাস করা যে আল্লাহ তাঁর বান্দার খুব কাছাকাছি, কিন্তু কীভাবে তা মানুষের অনুমানের মতো নয়।

Leave a Reply