Table of Contents
Toggleরিসালাত ও নবুওয়াত কাকে বলে ? রিসালাতের বিষয়বস্তু কি ?
রিসালাত (Risalah) আরবি শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ ‘বার্তা’, ‘চিঠি’ বা ‘দূত’, আর পারিভাষিকভাবে এর মানে হলো আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর নির্বাচিত নবী ও রাসূলগণের (যেমন: ইব্রাহিম, মুসা, ঈসা, মুহাম্মদ (সাঃ)) মাধ্যমে মানবজাতির কাছে পাঠানো ঐশীবাণী ও নির্দেশনা বা বার্তা বহন করার দায়িত্ব ও প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যা মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। এটি ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সকল নবী রাসুল গণ মানুষকে আল্লাহর পরিচয় দিতো। তাওহীদের বাণী প্রচার করতো। এই তাওহীদের বাণী প্রচারের কাজই হচ্ছে রিসালাত।
নবুওয়াত কী ?
নবুওয়াত হচ্ছে ইসলামিক শরিয়া ভিত্তিক এমন একটি মহান দায়িত্ব, যা মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর সকল বান্দাদের ভিতর থেকে বিশেষ কিছু বান্দাদের প্রদান করে থাকেন, যেন তারা মানুষের মধ্যে তাওহীদের দাওয়াত দেন, শিরক ও পাপ থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেন এবং ইসলামী শরীয়ত প্রতিষ্ঠা করেন।
কুরআনের আলোকে নবুওয়াতের সংজ্ঞা
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন:
অর্থঃ “আর আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতিতে একজন রসূল প্রেরণ করেছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং পরিহার কর তাগূতকে। অতঃপর তাদের মধ্য থেকে আল্লাহ কাউকে হিদায়াত দিয়েছেন এবং তাদের মধ্য থেকে কারো উপর পথভ্রষ্টতা সাব্যস্ত হয়েছে। সুতরাং তোমরা যমীনে ভ্রমণ কর অতঃপর দেখ, অস্বীকারকারীদের পরিণতি কীরূপ হয়েছে।”
সূরা আন-নাহল: ৩৬
মহান আল্লাহতায়ালা বলেন:
অর্থঃ “আমি তোমাকে সত্যসহ পাঠিয়েছি সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারীরূপে; আর এমন কোন জাতি নেই যার কাছে সতর্ককারী আসেনি।”
সুরা ফাতির আয়াত: ২৪
মহান আল্লাহতায়ালা বলেন:
অর্থঃ ” আর যখন তাদের নিকট কোন নিদর্শন আসে, তারা বলে, আমরা কখনই ঈমান আনব না, যতক্ষণ না আল্লাহর রাসূলদেরকে যা দেয়া হয়েছে আমাদেরকে তার অনুরূপ দেয়া হয়। আল্লাহ ভালো জানেন, তিনি কোথায় তাঁর রিসালাত অর্পণ করবেন। যারা অপরাধ করেছে, অচিরেই তাদেরকে আক্রান্ত করবে আল্লাহর নিকট লাঞ্ছনা ও কঠোর আযাব, কারণ তারা চক্রান্ত করত। “
সুরা আল-আনাম আয়াত: ১২৪
মহান আল্লাহতায়ালা বলেন:
অর্থঃ ” ওহে বস্ত্র আবৃত (ব্যক্তি)! , উঠ, অতঃপর সতর্ক কর। ,আর তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর।, আর তোমার পোশাক-পরিচ্ছদ পবিত্র কর। ,আর অপবিত্রতা বর্জন কর। “
সুরা আল-মুদ্দাসসির আয়াত: ১-৫
মহান আল্লাহতায়ালা বলেন:
অর্থঃ ” হে নবী, আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে।, আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহবানকারী ও আলোকদীপ্ত প্রদীপ হিসেবে। “
সুরা আল-আহযাব আয়াত: ৪৫-৪৬
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হচ্ছেন সর্বকালের সর্বযুগের সকল মানব জাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শের চাবিকাঠি । আল্লাহ্ তাঁকে এমন আদর্শ দিয়ে দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন যে তাঁর আদর্শই হচ্ছে আল্লাহর আদর্শ।
যারাই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শে আদর্শিত হবে তারাই আল্লাহর কাছে কৃতকার্য হবে। কোনো বান্দা আল্লাহর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বান্দা হতে পারবেনা যতক্ষননা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শে আদর্শিত হবে বা উনার আদর্শ ধারণ করবে।
মহান আল্লাহতায়ালা অন্য আরেকটি আয়াতে বলেন:
অর্থঃ ” অবশ্যই তোমাদের জন্য রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে। “
সুরা আল-আহযাব আয়াত: ২১
মহান আল্লাহতায়ালা অন্য আরেকটি আয়াতে বলেন:
অর্থঃ ” বল, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। “
সুরা আল-ইমরান আয়াত: ৩১
রিসালাতের মূল বিষয়গুলো:
আল্লাহ্ এক, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই—এই মৌলিক বিশ্বাস মানুষের কাছে তুলে ধরা।
রাসূল হলেন তিনি, যিনি নতুন শরীয়ত বা আইন নিয়ে আসেন; আর নবী হলেন যিনি পূর্বের রাসূলের শরীয়ত অনুসরণ করেন।
আল্লাহ্র প্রেরিত কিতাব (যেমন: কুরআন) ও সুন্নাহর মাধ্যমে জীবনযাপনের সঠিক নিয়মকানুন, নৈতিকতা ও শরিয়াহ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
মৃত্যুর পর জীবন, বিচার দিবস ও আখিরাতের (পরকাল) ধারণা সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করা এবং সে অনুযায়ী আমল করতে উদ্বুদ্ধ করা।
আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য নামাজ, রোজা, হজ, যাকাতসহ অন্যান্য ইবাদত ও সৎকাজের নিয়ম শেখানো।
পথহারা মানুষকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা এবং মানবজাতির কল্যাণ নিশ্চিত করা।
রিসালাতে বিশ্বাস মানে আল্লাহর প্রেরিত সকল নবী-রাসূল এবং তাঁদের আনীত সকল বার্তা (কুরআন, সুন্নাহ) সত্য বলে মেনে নেওয়া।
নবুওয়াতের মূল বিষয়:
আল্লাহ্র পক্ষ থেকে নির্বাচিত ব্যক্তির কাছে সরাসরি বার্তা প্রেরণ করা।
আল্লাহ্তায়ালার পক্ষ থেকে যিনি এই ঐশী বার্তা প্রাপ্ত হন এবং তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।
মানুষের হেদায়েত এর কথা বলা , আল্লাহর আইন ও নির্দেশনা প্রচার করা, এবং ভবিষ্যৎ বা আখিরাত সম্পর্কে অবহিত করা।
ফেরেশতা জিবরাঈল (আঃ) এর মাধ্যমে ওহী নাযিল হওয়া, যা একটি প্রধান পদ্ধতি।
রিসালাতের প্রয়োজনীয়তাঃ
পৃথিবীতে প্রথমে মানুষ আসার পর থেকে সবাই এক আল্লাহ্র ইবাদত করতো, এবং আল্লাহ কে জানত। পরবর্তীতে সময়ের সাথে সাথে মানুষ আল্লাহ্কে ভুলে যেতে থাকলো, এবং সমাজে বিভিন্ন রকম এর পাপ কাজ খারাপ কাজ করতে শুরু করল। সেইসাথে আল্লাহ্র পরিবর্তে বিভিন্ন উপাস্য তৈরি করতে লাগলো এবং পৃথিবীতে অরাজকতা সৃষ্টি করতে লাগলো। যা আল্লাহ্র তাওহীদের বিপরীত হতে লাগল ।
মানুষ যাতে আল্লাহ্কে ভুলে না যায় আল্লাহ তায়ালার আদেশ গুলো যেন মেনে চলে । তাঁর পরিবর্তে অন্য কাউকে উপাস্য গ্রহণ না করে বা তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরিক না করে তার জন্য যুগে যুগে আল্লাহর বিশেষ প্রতিনিধি হিসাবে নবী রাসুলদের পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।
যদি আল্লাহ্ নবী রাসুল প্রেরণ না করতেন তাহলে পৃথিবীতে কেউ আল্লাহ্কে চিনতে এবং জানতে পারতো না। সেইসাথে আল্লাহর কোনো বান্দা তাঁর ইবাদত বন্দেগীও করতো না।
তাই আল্লাহর আদেশ নিষেধ এবং ইবাদত করার জন্য নবী রাসুলগণ রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলেই আমরা আজ আল্লাহ্কে চিনতে এবং জানতে পেরেছি।
মহান আল্লাহতায়ালা অন্য আরেকটি আয়াতে বলেন:
অর্থঃ “আর যদি আমি তাদেরকে ইতঃপূর্বে কোন আযাব দ্বারা ধ্বংস করতাম তবে অবশ্যই, তারা বলত, ‘হে আমাদের রব, আপনি আমাদের কাছে কোন রাসূল পাঠালেন না কেন? তাহলে তো আমরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হওয়ার পূর্বে আপনার নিদর্শনাবলী অনুসরণ করতাম’।”
সূরা ত্বহা আয়াত: ১৩৪
মহান আল্লাহতায়ালা বলেনঃ
অর্থঃ “যে হিদায়াত গ্রহণ করে, সে তো নিজের জন্যই হিদায়াত গ্রহণ করে এবং যে পথভ্রষ্ট হয় সে নিজের (স্বার্থের) বিরুদ্ধেই পথভ্রষ্ট হয়। আর কোন বহনকারী অপরের (পাপের) বোঝা বহন করবে না। আর রসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত আমি আযাবদাতা নই।”
সূরা আল-ইসরা আয়াত: ১৫
উপরোক্ত আয়াত গুলো দ্বারা বুঝা যায় আল্লাহ্তায়ালা যুগে যুগে বিভিন্ন গোত্রে বা সম্প্রদায়ে লক্ষ লক্ষ নবী ও রসুল পাঠিয়েছেন , এই আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, যদি কোন সম্প্রদায়ে নবী ও রসুল না প্রেরণ করত সম্প্রদায়ের লোকজনের বিচার বা শাস্তি হত না।
কুরআন কারীম থেকে জানা যায় যে, মহান আল্লাহ সকল যুগে সকল জাতি ও সমাজেই নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। এরশাদ করা হয়েছে।
মহান আল্লাহতায়ালা বলেনঃ
অর্থঃ “আমি তোমাকে সত্যসহ পাঠিয়েছি সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারীরূপে; আর এমন কোন জাতি নেই যার কাছে সতর্ককারী আসেনি।”
সুরা ফাতির আয়াত: ২৪
মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে রাসূল বলে বিশ্বাস করার অর্থ তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু শিক্ষা দিয়েছেন, যা কিছু বলেছেন সবকিছুকে সন্দেহাতীত বলে সত্য বিশ্বাস করা। একজন মুসলিম সন্দেহাতীতরূপে বিশ্বাস করেন যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর মনোনীত নবী ও রসূল। মানবজাতির মুক্তির পথের নির্দেশনা দিতে, তাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সকল কল্যাণ শিক্ষা দিতে এবং অকল্যাণ থেকে সতর্ক করতে আল্লাহ তাঁকে মনোনীত করেছেন। মানবজাতির মুক্তির পথ, কল্যাণ ও অকল্যাণের সকল বিষয় আল্লাহ তাঁকে জানিয়েছেন এবং তা মানুষদেরকে শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব তাঁকে দান করেছেন।
মহান আল্লাহতায়ালা বলেনঃ
অর্থঃ “হে নবী, আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে।, আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহবানকারী ও আলোকদীপ্ত প্রদীপ হিসেবে।”
সূরা আহযাব আয়াত: ৪৫-৪৬
এ জন্যই ইমাম রাযী বলেছেন, “যে ব্যক্তি নবুওয়াত ও রিসালাতকে অস্বীকার করলো, প্রকৃতপক্ষে সে আল্লাহ’র মহান সত্তাকেই স্বীকৃতি দেওয়া থেকে বঞ্চিত রইলো।” এই জন্যই নবুওয়াত ও রিসালাতকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করা। মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মত, যখন তারা নিজেদের রসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সঠিকভাবে চেনার ব্যাপারে অগ্রগামী হয়েছে, তখন তাদের রব সম্বন্ধে সম্যক পরিচিতিও তারা পূর্ণরূপে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এ জন্যই এ উম্মতকে সমস্ত উম্মতের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়েছে।
মহান আল্লাহতায়ালা বলেনঃ
অর্থঃ“তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত,যাদেরকে মানুষের জন্য বের করা হয়েছে। তোমরা ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে, আর আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ করবে। আর যদি আহলে কিতাব ঈমান আনত, তবে অবশ্যই তা তাদের জন্য কল্যাণকর হত। তাদের কতক ঈমানদার। তাদের অধিকাংশই ফাসিক। ”
সূরা আল-ইমরান আয়াত: ১১০
আলহামদুলিল্লাহ , আল্লাহতায়ালা যেন আমাদেরকে ঈমান ও আমলের সহিত চলার তৌফিক দান করেন আমিন।
Share this:
- Print (Opens in new window) Print
- Share on LinkedIn (Opens in new window) LinkedIn
- Share on Reddit (Opens in new window) Reddit
- Share on Pinterest (Opens in new window) Pinterest
- Share on Telegram (Opens in new window) Telegram
- Share on WhatsApp (Opens in new window) WhatsApp
- Email a link to a friend (Opens in new window) Email
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on Tumblr (Opens in new window) Tumblr
